বিশেষ ইসলামিক দিবস ও মৌসুমী আমল
হিজরি নববর্ষ ও আল্লাহর মাস মহররম: আত্মসমালোচনা, হিজরতের শিক্ষা ও নতুন বছরের ঈমানী পরিকল্পনা
✍️ GSEN IT ইসলামিক রিসার্চ টিম
🗓️ ২০২৬-১০-১৬
⏱️ ৭ মিনিট পাঠ
👁️ 3,450 বার পঠিত
হিজরি সনের প্রথম মাস মহররমকে রাসূলুল্লাহ ﷺ 'শাহরুল্লাহিল মুহাররম' বা আল্লাহর মাস বলে অভিহিত করেছেন। রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো মহররম মাসের রোজা। জানুন হিজরি সনের ইতিহাস, আত্মসমালোচনা এবং মহররম মাসের সুন্নাহসম্মত আমল।
১. পটভূমি ও দ্বীনি জীবনের প্রাসঙ্গিকতা
পবিত্র কুরআনুল কারীম মানবজাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার এবং অনন্ত হেদায়েতের একমাত্র পথপ্রদর্শক। ডিজিটাল প্রযুক্তির এই উৎকর্ষের যুগে মানুষের অন্তরে আল্লাহর কালাম ও সুন্নাহর সঠিক বোধ জাগ্রত রাখা সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। "হিজরি নববর্ষ ও আল্লাহর মাস মহররম: আত্মসমালোচনা, হিজরতের শিক্ষা ও নতুন বছরের ঈমানী পরিকল্পনা" বিষয়টি কেবল একটি তত্ত্বীয় আলোচনা নয়, বরং প্রতিটি মুমিনের দৈনন্দিন আত্মিক উন্নতি ও পরকালীন সাফল্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
২. পবিত্র কুরআনের নূরানী শিক্ষা ও দলিল
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنظُرْ نَفْسٌ مَّا قَدَّمَتْ لِغَدٍ ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ
"হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো; এবং প্রত্যেকেরই চিন্তা করে দেখা উচিত যে আগামীকালের (পরকালের) জন্য সে কী প্রেরণ করেছে। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো; তোমরা যা করো আল্লাহ সে সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত।"
(সূরা আল-হাশর: ১৮)
উপরোক্ত আয়াতটির গভীরতা আমাদের স্পষ্ট করে দেয় যে, মানবজীবনের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস মহান রবের হুকুমের অধীন। যখন একজন মুমিন নিষ্ঠার সাথে এই নির্দেশগুলো জীবনে প্রতিফলিত করে, তখন তার চিন্তা, চরিত্র ও পারিবারিক পরিমণ্ডলে আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হয়।
৩. প্রিয় নবী ﷺ-এর সুন্নাহ ও সহীহ হাদিস
📜 সহীহ হাদিসের অমূল্য বাণী:
"রমজান মাসের ফরজ রোজার পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররমের রোজা; এবং ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম নামাজ হলো রাতের (তাহাজ্জুদ) নামাজ।"
— সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ১১৬৩
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ হলো কুরআনকে বাস্তবে প্রয়োগ করার নিখুঁত চিত্র। হাদিস শরীফে বর্ণিত এই দিকনির্দেশনা অনুসরণ করার মাধ্যমেই একজন মানুষ পরিপূর্ণ মুমিন হিসেবে আল্লাহর প্রিয়পাত্র হতে পারে।
স্পন্সরড বিজ্ঞাপন / Sponsored Content
৪. মূল বিষয়ের বিস্তারিত আলোচনা ও শিক্ষা
হিজরি নববর্ষ ও মহররম মাস: ত্যাগের মহিমা ও নতুন বছরের ঈমানী হিসাব
ইসলামী বা হিজরি বর্ষপঞ্জি শুরু হয় পবিত্র মহররম (المحرم) মাসের মাধ্যমে। পৃথিবীর অন্যান্য জাতি যেখানে তাদের বর্ষগণনা শুরু করেছে কোনো রাজার সিংহাসনারোহণ, যুদ্ধজয় বা উৎসবকে কেন্দ্র করে, সেখানে মুসলিম উম্মাহর বর্ষগণনা শুরু হয়েছে হিজরত বা দ্বীনের জন্য সর্বস্ব ত্যাগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে!
১. মহররম মাসের ৩টি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য
1. **আশহুরুল হুরুম (সম্মানিত হারাম মাস)**: কুরআনে বর্ণিত চারটি পবিত্র ও নিষিদ্ধ মাসের অন্যতম হলো মহররম।
2. **শাহরুল্লাহ (আল্লাহর মাস)**: বারো মাসের মধ্যে কেবল মহররম মাসকেই হাদিসে সরাসরি আল্লাহর নামের সাথে সম্বন্ধ করে **'শাহরুল্লাহিল মুহাররম'** বলা হয়েছে।
3. **রমজানের পর সর্বশ্রেষ্ঠ রোজার মাস**: হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত সহীহ মুসলিমের হাদিসে (১১৬৩) রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: *"রমজানের রোজার পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররমের রোজা।"* তাই এ মাসে আশুরার ২টি রোজার পাশাপাশি সোম-বৃহস্পতিবার ও আইয়ামে বীজসহ যত বেশি সম্ভব নফল রোজা রাখা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
২. মুহাসাবা: একটি বছর চলে যাওয়ার প্রকৃত অর্থ
বিশিষ্ট তাবেয়ী হাসান বসরী (রহ.) বলতেন:
> **"হে আদম সন্তান! তুমি তো কেবল কিছু দিন ও সময়ের সমষ্টি মাত্র। যখন তোমার জীবন থেকে একটি দিন বা একটি বছর চলে যায়, তখন মূলত তোমার নিজেরই একটি অংশ ক্ষয় হয়ে কবরের দিকে এগিয়ে যায়!"**
হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলতেন: "হাসিবূ আনফুসাকুম কাবলা আন তুহাসাবূ" — অর্থাৎ কিয়ামতের ময়দানে তোমাদের হিসাব নেওয়ার আগেই আজ দুনিয়াতে বসে নিজেদের আমলের হিসাব নাও!
৩. নতুন হিজরি বছরের ৪টি ঈমানী সংকল্প
- **পাপ থেকে হিজরত**: নবীজি ﷺ বলেছেন, প্রকৃত মুহাজির সেই যে আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজ ছেড়ে দেয় (সহীহ বুখারী: ১০)। নতুন বছরে অন্তত একটি বদঅভ্যাস চিরতরে ত্যাগ করার শপথ নিন।
- **দৈনিক কুরআন পাঠ**: প্রতিদিন ফজরের পর বা রাতে অন্তত ১৫ মিনিট অর্থসহ কুরআন অধ্যয়নের অভ্যাস গড়ুন।
- **পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ**: জীবনে আর কখনোই যেন এক ওয়াক্ত ফরজ নামাজ কাজা না হয়।
- **হালাল রিযিক ও সুন্দর চরিত্র**: পরিবার ও সমাজের সাথে সুন্নাহসম্মত কোমল আচরণ বজায় রাখা।
📋 আমলের ব্যবহারিক চেকলিস্ট:
- হিজরি নববর্ষের শুরুতে বিগত এক বছরের আমলনামার হিসাব নেওয়া (মুহাসাবা) এবং নতুন বছরের জন্য কুরআন ও ইবাদতের রুটিন তৈরি করা।
- শুধু আশুরার রোজাই নয়, বরং পুরো মহররম মাস জুড়ে যত বেশি সম্ভব নফল রোজা রাখা (সহীহ মুসলিম: ১১৬৩)।
- চারটি সম্মানিত হারাম মাসের প্রথম মাস হিসেবে মহররম মাসে সকল প্রকার গুনাহ ও জুলুম থেকে বেঁচে থাকা।
- রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবায়ে কেরামের ঐতিহাসিক হিজরতের শিক্ষা—অর্থাৎ পাপ ও অবাধ্যতা ত্যাগ করে আল্লাহর আনুগত্যের দিকে হিজরত করা।
৫. এক নজরে আল কুরআন প্ল্যাটফর্মের সুবিধা
আপনার এই আমলকে সহজ ও নিয়মিত করতে এক নজরে আল কুরআন প্ল্যাটফর্মে সংযুক্ত করা হয়েছে আধুনিক ডিজিটাল ফিচারসমূহ। ইসলামিক ক্যালেন্ডার, বিশেষ দিবসের মাসনূন আমল ও সহীহ দোয়া সংকলন সহ আপনি পাচ্ছেন ১১৪টি সূরার শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণ, অডিও এবং বিষয়ভিত্তিক সার্চ সুবিধা।
👉 বিশেষ সুবিধা: আজকের নামাজ ও সেহরি-ইফতারের সময়সূচি দেখুন →
মোবাইলে বিজ্ঞাপনমুক্ত কুরআন পাঠ ও আমল করুন
১১৪টি সূরার বিশুদ্ধ বাংলা অর্থ, সুললিত অডিও তিলাওয়াত, নামাজের সঠিক সময়সূচী, কিবলা কম্পাস ও ডিজিটাল তাসবিহ সহ সম্পূর্ণ ফ্রি অ্যাপ ডাউনলোড করুন।
Google Play থেকে ইনস্টল করুন
➜
প্রায়শ জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
প্রশ্ন: হিজরি সন কে এবং কখন প্রবর্তন করেন?
উত্তর: ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর ফারুক (রা.)-এর খেলাফতকালে (১৭ হিজরিতে) হযরত আলী (রা.) ও অন্যান্য সাহাবীদের পরামর্শক্রমে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মক্কা থেকে মদিনায় ঐতিহাসিক হিজরতের বছরকে ভিত্তি ধরে 'হিজরি সন' প্রবর্তন করা হয় এবং সম্মানিত হারাম মাস মহররমকে বছরের প্রথম মাস নির্ধারণ করা হয়।
প্রশ্ন: কেন মহররম মাসকে 'শাহরুল্লাহ' বা আল্লাহর মাস বলা হয়েছে?
উত্তর: আকাশ ও পৃথিবীর সব মাসই আল্লাহর সৃষ্টি, তবুও বিশেষ সম্মান ও মর্যাদার কারণে (যেমন কাবাকে বাইতুল্লাহ বা আল্লাহর ঘর বলা হয়) রাসূলুল্লাহ ﷺ মহররম মাসকে 'শাহরুল্লাহিল মুহাররম' বা আল্লাহর মাস মহররম বলে নামকরণ করেছেন এবং এ মাসের রোজাকে রমজানের পর শ্রেষ্ঠ রোজা বলেছেন (সহীহ মুসলিম: ১১৬৩)।
প্রশ্ন: প্রকৃত মুহাজির বা হিজরতকারী কে?
উত্তর: সহীহ বুখারীর হাদিসে (১০) রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: 'প্রকৃত মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিমরা নিরাপদ থাকে; আর প্রকৃত মুহাজির (হিজরতকারী) সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহ তাআলা যা নিষেধ করেছেন (সকল গুনাহ ও পাপ) তা পরিত্যাগ করে!'
সম্পর্কিত আরও আর্টিকেল